Dhaka 1:43 am, Sunday, 28 June 2026

মুনাফার পথে না হেঁটে কৃষকের পাশে, আব্দুল আওয়াল মিন্টুর কৃষিযাত্রা

বাংলাদেশের কৃষিখাতে নীরবে প্রভাব রেখে যারা কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম নাম আব্দুল আওয়াল মিন্টু। উন্নত ও নির্ভরযোগ্য বীজের মাধ্যমে কৃষকদের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত করার যে উদ্যোগ, তার অন্যতম পথিকৃৎ তিনি।

১৯৯০ এর দশকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের আমন্ত্রণে নেদারল্যান্ডসের কৃষি বিজ্ঞানী সাইমন গ্রুট বাংলাদেশে আসেন। ঢাকার একটি হোটেলে কাকতালীয় সাক্ষাতে এক আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের কৃষি বাস্তবতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। উন্নত ও রোগসহনশীল বীজের অভাব, ভুল বীজে ভুল ফসল, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের খরচে কৃষকের লোকসানের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, এ অবস্থা কৃষকদের জন্য প্রায় দাসপ্রথার মতো।

এই কথাগুলো গভীরভাবে নাড়া দেয় তৎকালীন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আব্দুল আওয়াল মিন্টুকে। পরবর্তীতে তিনি জাপান থেকে উন্নতমানের বীজ এনে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেন। ফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় ১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বীজ উৎপাদন ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লাল তীর।

বর্তমানে লাল তীর দেশের মোট বীজ বাজারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই সাধারণ কৃষকদের নাগালে বীজ পৌঁছে দেওয়ার নীতিতে কাজ করেছে। নিজস্ব গবেষণাগার, দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গবেষণা দল, মাঠপর্যায়ে বিনামূল্যে বীজ ও উপকরণ দিয়ে পরীক্ষামূলক চাষ সবকিছুই ছিল কৃষকের বাস্তব প্রয়োজনকে সামনে রেখে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাল তীরের গবেষণা মাঠ রয়েছে। পাশাপাশি গরু ও মহিষের উন্নত সিমেন নিয়েও গবেষণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য লবণাক্ততা সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে বাগেরহাটের রামপালে স্থাপিত গবেষণা কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নদীতে উজানের বাঁধের কারণে বাড়তে থাকা লবণাক্ততায় যে জমিগুলো চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, সেগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে এসব গবেষণার মাধ্যমে।

যেখানে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত মুনাফার খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী, সেখানে আব্দুল আওয়াল মিন্টু বেছে নিয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কৃষকের জন্য লাভজনক পথ। ফলে গ্রামবাংলায় ‘লাল তীর’ এখন ন্যায্য দামে নির্ভরযোগ্য বীজের প্রতীক। বীজ বপনের পর চারা না ওঠার অনিশ্চয়তা কিংবা ভুল ফসলের ভয় অনেকটাই কমেছে বলে জানান কৃষকরা।

টেক্সটাইল, রডসহ বিভিন্ন খাতে সফল ব্যবসায়ী হয়েও নিশ্চিত লাভের পথ ছেড়ে কৃষিখাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তাকে আলাদা করেছে। যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তাদের মতে তিনি প্রচারবিমুখ, ভদ্র ও বিনয়ী একজন মানুষ।

মাঠের কৃষকদের অভিজ্ঞতায় আব্দুল আওয়াল মিন্টু আজ কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, বরং কৃষির প্রতি নীরব দায়িত্ববোধের প্রতীক।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রামপালে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ: মামলা, গ্রেপ্তার ১

মুনাফার পথে না হেঁটে কৃষকের পাশে, আব্দুল আওয়াল মিন্টুর কৃষিযাত্রা

প্রকাশঃ 09:31:42 am, Monday, 19 January 2026

বাংলাদেশের কৃষিখাতে নীরবে প্রভাব রেখে যারা কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম নাম আব্দুল আওয়াল মিন্টু। উন্নত ও নির্ভরযোগ্য বীজের মাধ্যমে কৃষকদের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত করার যে উদ্যোগ, তার অন্যতম পথিকৃৎ তিনি।

১৯৯০ এর দশকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের আমন্ত্রণে নেদারল্যান্ডসের কৃষি বিজ্ঞানী সাইমন গ্রুট বাংলাদেশে আসেন। ঢাকার একটি হোটেলে কাকতালীয় সাক্ষাতে এক আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের কৃষি বাস্তবতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। উন্নত ও রোগসহনশীল বীজের অভাব, ভুল বীজে ভুল ফসল, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের খরচে কৃষকের লোকসানের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, এ অবস্থা কৃষকদের জন্য প্রায় দাসপ্রথার মতো।

এই কথাগুলো গভীরভাবে নাড়া দেয় তৎকালীন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আব্দুল আওয়াল মিন্টুকে। পরবর্তীতে তিনি জাপান থেকে উন্নতমানের বীজ এনে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেন। ফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় ১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বীজ উৎপাদন ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লাল তীর।

বর্তমানে লাল তীর দেশের মোট বীজ বাজারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই সাধারণ কৃষকদের নাগালে বীজ পৌঁছে দেওয়ার নীতিতে কাজ করেছে। নিজস্ব গবেষণাগার, দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গবেষণা দল, মাঠপর্যায়ে বিনামূল্যে বীজ ও উপকরণ দিয়ে পরীক্ষামূলক চাষ সবকিছুই ছিল কৃষকের বাস্তব প্রয়োজনকে সামনে রেখে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাল তীরের গবেষণা মাঠ রয়েছে। পাশাপাশি গরু ও মহিষের উন্নত সিমেন নিয়েও গবেষণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য লবণাক্ততা সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে বাগেরহাটের রামপালে স্থাপিত গবেষণা কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নদীতে উজানের বাঁধের কারণে বাড়তে থাকা লবণাক্ততায় যে জমিগুলো চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, সেগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে এসব গবেষণার মাধ্যমে।

যেখানে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত মুনাফার খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী, সেখানে আব্দুল আওয়াল মিন্টু বেছে নিয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কৃষকের জন্য লাভজনক পথ। ফলে গ্রামবাংলায় ‘লাল তীর’ এখন ন্যায্য দামে নির্ভরযোগ্য বীজের প্রতীক। বীজ বপনের পর চারা না ওঠার অনিশ্চয়তা কিংবা ভুল ফসলের ভয় অনেকটাই কমেছে বলে জানান কৃষকরা।

টেক্সটাইল, রডসহ বিভিন্ন খাতে সফল ব্যবসায়ী হয়েও নিশ্চিত লাভের পথ ছেড়ে কৃষিখাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তাকে আলাদা করেছে। যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তাদের মতে তিনি প্রচারবিমুখ, ভদ্র ও বিনয়ী একজন মানুষ।

মাঠের কৃষকদের অভিজ্ঞতায় আব্দুল আওয়াল মিন্টু আজ কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, বরং কৃষির প্রতি নীরব দায়িত্ববোধের প্রতীক।