Dhaka 1:54 pm, Friday, 17 April 2026

পলিথিনে মোড়ানো অ্যাম্বুলেন্স রিকশাভ্যানই রোগীদের ভরসা

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অ্যানেসথেটিস্ট (অবেদনবিদ) না থাকায় অস্ত্রোপচার বন্ধ। ফলে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

অ্যাম্বুলেন্স চালককে বদলি করা হয়েছে। শুধু চালকের অভাবে অ্যাম্বুলেন্সটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কোনায় পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে।

জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসা নিতে আসা বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর থেকেই কার্ডিওলজি, শিশুরোগ, সার্জারি, চক্ষুবিদ্যা, গাইনি, স্কিন এলডিডি, অর্থোপেডিক, মেডিসিন, সার্জারি, ইএনটি ও অ্যানেসথেসিয়া এই ১১টি পদের বিপরীতে ১১ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা।

কিন্তু শুধু অর্থোপেডিক ও গাইনি পদে দুজন চিকিৎসক থাকলেও শূন্য রয়েছেন ৯ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ। একইভাবে ১৩ মেডিকেল অফিসারের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আটজনের পদ থাকলেও কর্মরত সাতজন, টেকনোলজিস্টের সাতটি পদের মধ্যে কর্মরত চারজন।

তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৬৫ জনের পদ থাকলেও কর্মরত ৩৪ জন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ২১টি পদ থাকলেও কর্মরত ১১ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাঁচজনের পদ থাকলেও কর্মরত চারজন। এর মধ্যে আবার একজন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। আয়া দুজনের পদ থাকলেও দুটি পদই শূন্য।

অ্যাম্বুলেন্স চালকের একটি পদ থাকলেও সেটিও শূন্য রয়েছে। তবে একমাত্র নার্স ৩৭ জনের মধ্যে ৩৭ জনই কর্মরত রয়েছেন। ১৭০ পদের মধ্যে ৯ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ১০ মেডিকেল অফিসারসহ ৬৮টি পদ শূন্য রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে অ্যানেসথেসিয়া পদটি শূন্য থাকায় অপারেশন বন্ধ। অথচ আগে প্রতি মাসে প্রসূতির সিজারসহ বিভিন্ন ধরনের ১০ থেকে ১৫টি অপারেশন করা হতো। একইভাবে অ্যাম্বুলেন্স চালকের পদটি শূন্য থাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে গাড়িটি।

মুমূর্ষু রোগীরা পাচ্ছেন না অ্যাম্বুলেন্সসেবা। শূন্য রয়েছে পুষ্টিবিদ, ফিজিওথেরাপিস্ট ও ইসিজির (কার্ডিওগ্রাফির) পদ। অন্য চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান দিয়ে এ পদের কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

ফুলবাড়ী নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মো. হামিদুল হক বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাবে এমনিতেই তো সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। চিকিৎসকের বদলে চিকিৎসা দিচ্ছেন ডেন্টাল টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্টসহ উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা। একই সঙ্গে নতুন একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও রহস্যজনক কারণে চালককে এখান থেকে বদলি করে অন্যত্র নেওয়া হয়েছে।

এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীদের এখন অটোরিকশা-ভ্যানের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা-নেওয়ার জন্য। আর অন্য কোনো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হলে ব্যক্তিপর্যায়ের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে হচ্ছে। এতে গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মশিউর রহমান বলেন, স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই হিমশিম খাচ্ছেন। চিকিৎসকের অভাবে ডেন্টাল টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্টসহ উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের দিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রে মেডিকেল অফিসাররাই চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয়সংখ্যক যন্ত্রপাতি থাকলেও শুধু অ্যানেসথেসিয়া পদটি শূন্য থাকায় কোনো অপারেশনই করা যাচ্ছে না। চালকের অভাবে নতুন অ্যাম্বুলেন্সটি রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কোণে রাখা হয়েছে। চালকের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে কবে চালক আসবে তা বলা মুশকিল।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় কেডিএস-এর ঈদ পুনর্মিলনী ও বৈশাখী শোভাযাত্রা

পলিথিনে মোড়ানো অ্যাম্বুলেন্স রিকশাভ্যানই রোগীদের ভরসা

প্রকাশঃ 05:00:05 am, Wednesday, 30 April 2025
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অ্যানেসথেটিস্ট (অবেদনবিদ) না থাকায় অস্ত্রোপচার বন্ধ। ফলে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

অ্যাম্বুলেন্স চালককে বদলি করা হয়েছে। শুধু চালকের অভাবে অ্যাম্বুলেন্সটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কোনায় পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে।

জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসা নিতে আসা বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর থেকেই কার্ডিওলজি, শিশুরোগ, সার্জারি, চক্ষুবিদ্যা, গাইনি, স্কিন এলডিডি, অর্থোপেডিক, মেডিসিন, সার্জারি, ইএনটি ও অ্যানেসথেসিয়া এই ১১টি পদের বিপরীতে ১১ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা।

কিন্তু শুধু অর্থোপেডিক ও গাইনি পদে দুজন চিকিৎসক থাকলেও শূন্য রয়েছেন ৯ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ। একইভাবে ১৩ মেডিকেল অফিসারের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আটজনের পদ থাকলেও কর্মরত সাতজন, টেকনোলজিস্টের সাতটি পদের মধ্যে কর্মরত চারজন।

তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৬৫ জনের পদ থাকলেও কর্মরত ৩৪ জন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ২১টি পদ থাকলেও কর্মরত ১১ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাঁচজনের পদ থাকলেও কর্মরত চারজন। এর মধ্যে আবার একজন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। আয়া দুজনের পদ থাকলেও দুটি পদই শূন্য।

অ্যাম্বুলেন্স চালকের একটি পদ থাকলেও সেটিও শূন্য রয়েছে। তবে একমাত্র নার্স ৩৭ জনের মধ্যে ৩৭ জনই কর্মরত রয়েছেন। ১৭০ পদের মধ্যে ৯ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ১০ মেডিকেল অফিসারসহ ৬৮টি পদ শূন্য রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে অ্যানেসথেসিয়া পদটি শূন্য থাকায় অপারেশন বন্ধ। অথচ আগে প্রতি মাসে প্রসূতির সিজারসহ বিভিন্ন ধরনের ১০ থেকে ১৫টি অপারেশন করা হতো। একইভাবে অ্যাম্বুলেন্স চালকের পদটি শূন্য থাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে গাড়িটি।

মুমূর্ষু রোগীরা পাচ্ছেন না অ্যাম্বুলেন্সসেবা। শূন্য রয়েছে পুষ্টিবিদ, ফিজিওথেরাপিস্ট ও ইসিজির (কার্ডিওগ্রাফির) পদ। অন্য চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান দিয়ে এ পদের কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

ফুলবাড়ী নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মো. হামিদুল হক বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাবে এমনিতেই তো সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। চিকিৎসকের বদলে চিকিৎসা দিচ্ছেন ডেন্টাল টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্টসহ উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা। একই সঙ্গে নতুন একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও রহস্যজনক কারণে চালককে এখান থেকে বদলি করে অন্যত্র নেওয়া হয়েছে।

এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীদের এখন অটোরিকশা-ভ্যানের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা-নেওয়ার জন্য। আর অন্য কোনো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হলে ব্যক্তিপর্যায়ের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে হচ্ছে। এতে গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মশিউর রহমান বলেন, স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই হিমশিম খাচ্ছেন। চিকিৎসকের অভাবে ডেন্টাল টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্টসহ উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের দিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রে মেডিকেল অফিসাররাই চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয়সংখ্যক যন্ত্রপাতি থাকলেও শুধু অ্যানেসথেসিয়া পদটি শূন্য থাকায় কোনো অপারেশনই করা যাচ্ছে না। চালকের অভাবে নতুন অ্যাম্বুলেন্সটি রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কোণে রাখা হয়েছে। চালকের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে কবে চালক আসবে তা বলা মুশকিল।