কোটালীপাড়ায় চোর সন্দেহে আটককে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার- ৩
কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি:কাজী শাহীন
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার ঘাঘরকান্দা এলকায় চোর সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ।
সংঘর্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অন্তত পাঁচ নেতাসহ নারী-পুরুষ মিলিয়ে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়।
মঙ্গলবার (২ জুন) ঘাঘরকান্দা গ্রামের জলিল গাজী বাদী হয়ে কোটালীপাড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও ২০০ থেকে ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যায় ব্যাটারি চুরির অভিযোগে উপজেলার কাঠিগা গ্রামের মোরসালিন কাজী, চিতশী গ্রামের রাসেল দাড়িয়া এবং ঘাঘরকান্দা গ্রামের আব্দুল্লাহ দাড়িয়াকে আটক করে বেপারীপাড়া গ্রামের মাদকবিরোধী কমিটির কার্যালয়ে রাখা হয়। এ সময় তাদের ব্যাপক মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে রয়েছেন পিঞ্জুরী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মুকুল মুন্সী (৪৮), যুবদল নেতা হানিফ বরকতউল্লাহ (৪৫), পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জসীম গাজী, ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খলিল গাজী (৪৮) এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রচার সম্পাদক জলিল গাজী (৪৬)।
এছাড়া আহতদের মধ্যে রয়েছেন কাঠিগা গ্রামের হান্নান বরকতউল্লাহ (৫৫), অলি বরকতউল্লাহ (৩৫), তাওসীন বরকতউল্লাহ, হাবিব মুন্সী (৪২), জাহিদুল বরকতউল্লাহ (৩৮), মেরী বেগম (৪২) এবং ঘাঘরকান্দা গ্রামের ওহাব গাজী (৬০), জালাল গাজী (৪৫), আরিফুল গাজী (৩০), ছনিয়া খানম (১৯), মাজেদা বেগম (৪৫)সহ আরও কয়েকজন। আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে যান।
মামলার বাদী জলিল গাজীর অভিযোগ, কাঠিগা ও চিতশী গ্রামের বিপুল সংখ্যক লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালিয়ে মাদকবিরোধী কমিটির কার্যালয় ও আশপাশের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে এবং আটক তিন ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে আহত হান্নান বরকতউল্লাহ বলেন, “ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আমি ভ্যানে করে ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন শুনতে পাই একটি ঘরের ভেতরে কয়েকজনকে চোর বলে মারধর করা হচ্ছে। আমি তাদের বলি, কেউ চোর হয়ে থাকলে আইন নিজেদের হাতে তুলে না নিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করুন। পরে দেখি আমার এক ভাতিজাকেও মারধর করা হচ্ছে। আমি প্রতিবাদ করলে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। স্থানীয় লোকজন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর এলাকায় কী হয়েছে, তা আমি আর জানি না।”
চোর সন্দেহে আটক মোরসালিন কাজী অভিযোগ করে বলেন, “বড় ভাইয়ের পাঠানো টাকা বাজার থেকে তুলে বাড়ি ফিরছিলাম। ঘাঘর খেয়া পার হওয়ার পর কয়েকজন আমাকে ঘিরে ধরে একটি টিনের ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে আমার ওপর ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। তারা বলে এলাকায় গাড়ির ব্যাটারি চুরি হয়েছে এবং আমাকে ওই চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেয়। কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”
উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রচার সম্পাদক জলিল গাজী বলেন, “আমাদের গ্রামের এক ব্যক্তির গাড়ি থেকে ব্যাটারি চুরির অভিযোগে মোরসালিন, রাসেল ও আব্দুল্লাহকে আটক করা হয়েছিল। তাদের আটকের পর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে ছাত্রলীগ নেতা রুবেলের নেতৃত্বে কাঠিগা ও চিতশী গ্রামের লোকজন এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়, কার্যালয় ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে এবং আটক ব্যক্তিদের ছিনিয়ে নিয়ে যায়।”
কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “ঘটনার পর এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ঘাঘরকান্দা গ্রামের মোহাম্মদ হাওলাদারের ছেলে মহন হাওলাদার (২০), মজিদ দাড়িয়ার ছেলে শেরজন দাড়িয়া এবং কাঠিগা গ্রামের খোকন ফকির (৪২)-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, মামলায় ৩০ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি ২০০ থেকে ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
দেশের তথ্য ডেস্ক 


















