Dhaka 3:22 am, Sunday, 28 June 2026

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির ভিড়ে অবহেলিত পাইকগাছা—বাঁশের সাঁকোই যেখানে মানুষের নিয়তি

 

পাইকগাছা প্রতিনিধি

স্মার্ট বাংলাদেশ ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রার বড় বড় স্লোগানের ভিড়েও খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালীর কাটাবুনিয়া মধ্যরচক যেন এখনো এক অবহেলিত ও উপেক্ষিত জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও এলাকাটির একমাত্র চলাচলের রাস্তাটি আজও কাঁচা ও অপ্রশস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বর্ষা মৌসুম এলেই পানি উঠে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা, আর তখন বাঁশের সাঁকোই হয়ে ওঠে শত শত মানুষের একমাত্র ভরসা।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাইকগাছা-কয়রা সড়কের গজালিয়া বানলা থেকে চাঁদখালী গজালিয়া সড়কের কলমিবুনিয়া পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার রাস্তার বড় অংশই কাঁচা মাটির। নিচু ও সংকীর্ণ হওয়ায় বর্ষায় অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ও কাদামাটি ভরা পথে চলাচল করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সম্ভাবনাময় এই জনপদটি শুধুমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণেই পিছিয়ে পড়ছে। উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে যেমন সমস্যা হয়, তেমনি জরুরি প্রয়োজনে রোগী পরিবহনেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

স্কুলশিক্ষার্থী ওবায়দুল্লাহ বলেন, “বর্ষায় বাঁশের সাঁকো আর কাদার রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যেতে হয়। অনেক সময় পড়ে গিয়ে বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়, খুব কষ্ট হয়।”

স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল হোসেন মোড়ল বলেন, “রাস্তাঘাট ভালো না থাকায় আমাদের পড়াশোনা, চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে। জরুরি রোগী নিয়ে যেতে গেলেও অনেক কষ্ট হয়।”

এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। গৃহবধূ মমতা বলেন, “শিশু সন্তান কোলে নিয়ে কলস মাথায় বাঁশের সাঁকো পার হয়ে পানি আনতে হয়। একটু বৃষ্টি হলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।”

বয়োবৃদ্ধ শহর আলী মোড়ল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বছরের পর বছর অবহেলিত। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু আমাদের এলাকার উন্নয়ন হয় না। ভোটের সময় সবাই প্রতিশ্রুতি দেয়, পরে আর কেউ খোঁজ রাখে না।”

সাবেক ইউপি সদস্য আক্কাস আলী ঢালী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে কাটাবুনিয়া এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। বর্ষার আগে জরুরি ভিত্তিতে রাস্তার সংস্কার ও কালভার্ট নির্মাণ না হলে আবারও মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে।

তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া এই এলাকার বাস্তব উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী শাফিন শোয়েব জানান, রাস্তাটি দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে কাটাবুনিয়া এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।

তবে এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন—উন্নয়নের আশ্বাস কবে বাস্তবে রূপ নেবে? আর কতদিন বাঁশের সাঁকোই থাকবে কাটাবুনিয়ার মানুষের নিয়তি?

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রামপালে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ: মামলা, গ্রেপ্তার ১

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির ভিড়ে অবহেলিত পাইকগাছা—বাঁশের সাঁকোই যেখানে মানুষের নিয়তি

প্রকাশঃ 02:43:33 pm, Monday, 18 May 2026

 

পাইকগাছা প্রতিনিধি

স্মার্ট বাংলাদেশ ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রার বড় বড় স্লোগানের ভিড়েও খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালীর কাটাবুনিয়া মধ্যরচক যেন এখনো এক অবহেলিত ও উপেক্ষিত জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও এলাকাটির একমাত্র চলাচলের রাস্তাটি আজও কাঁচা ও অপ্রশস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বর্ষা মৌসুম এলেই পানি উঠে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা, আর তখন বাঁশের সাঁকোই হয়ে ওঠে শত শত মানুষের একমাত্র ভরসা।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাইকগাছা-কয়রা সড়কের গজালিয়া বানলা থেকে চাঁদখালী গজালিয়া সড়কের কলমিবুনিয়া পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার রাস্তার বড় অংশই কাঁচা মাটির। নিচু ও সংকীর্ণ হওয়ায় বর্ষায় অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ও কাদামাটি ভরা পথে চলাচল করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সম্ভাবনাময় এই জনপদটি শুধুমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণেই পিছিয়ে পড়ছে। উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে যেমন সমস্যা হয়, তেমনি জরুরি প্রয়োজনে রোগী পরিবহনেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

স্কুলশিক্ষার্থী ওবায়দুল্লাহ বলেন, “বর্ষায় বাঁশের সাঁকো আর কাদার রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যেতে হয়। অনেক সময় পড়ে গিয়ে বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়, খুব কষ্ট হয়।”

স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল হোসেন মোড়ল বলেন, “রাস্তাঘাট ভালো না থাকায় আমাদের পড়াশোনা, চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে। জরুরি রোগী নিয়ে যেতে গেলেও অনেক কষ্ট হয়।”

এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। গৃহবধূ মমতা বলেন, “শিশু সন্তান কোলে নিয়ে কলস মাথায় বাঁশের সাঁকো পার হয়ে পানি আনতে হয়। একটু বৃষ্টি হলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।”

বয়োবৃদ্ধ শহর আলী মোড়ল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বছরের পর বছর অবহেলিত। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু আমাদের এলাকার উন্নয়ন হয় না। ভোটের সময় সবাই প্রতিশ্রুতি দেয়, পরে আর কেউ খোঁজ রাখে না।”

সাবেক ইউপি সদস্য আক্কাস আলী ঢালী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে কাটাবুনিয়া এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। বর্ষার আগে জরুরি ভিত্তিতে রাস্তার সংস্কার ও কালভার্ট নির্মাণ না হলে আবারও মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে।

তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া এই এলাকার বাস্তব উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী শাফিন শোয়েব জানান, রাস্তাটি দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে কাটাবুনিয়া এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।

তবে এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন—উন্নয়নের আশ্বাস কবে বাস্তবে রূপ নেবে? আর কতদিন বাঁশের সাঁকোই থাকবে কাটাবুনিয়ার মানুষের নিয়তি?