Dhaka 1:36 am, Sunday, 28 June 2026

কোটি টাকার সড়ক কাজে চরম অবহেলা, উন্নয়নের নামে জনগণের সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রতারণা

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি
যে সড়ক দিয়ে মানুষের স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই সড়কই আজ হয়ে উঠেছে দুর্ভোগ, কান্না আর ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি। কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে খুঁড়ে ফেলে রাখা রাস্তা এখন কাদাপানি আর জলাবদ্ধতার এক নীরব অভিশাপ।

সামান্য বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানিতেই ডুবে যায় পুরো সড়ক, থেমে যায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। স্কুলগামী শিশুদের কাদা মাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে, অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্বজনদের, আর বৃদ্ধরা ঘরবন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনে যে মানুষ স্বস্তির স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তাদের কণ্ঠেই উচ্চারিত হচ্ছে হতাশা আর ক্ষোভ—এ কেমন উন্নয়ন, যেখানে জনগণের ভাগ্যে জুটেছে শুধু দুর্ভোগ আর দীর্ঘশ্বাস!

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নের শংকরদানা খেয়াঘাটে নির্মাণাধীন সেতু এলাকা থেকে তেঁতুলতলা হয়ে কাঁঠামারি বাজার পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৯শ’ ৪০ মিটার কার্পেটিং (পিচ) সড়ক নির্মাণ কাজ এখন ধীরগতির কারণে জনদুর্ভোগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আম্ফান পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এ উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব পায় চুয়াডাঙ্গার জাকাউল্লাহ এ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার কিছু অংশে নামমাত্র বালু ফেলে অধিকাংশ অংশ অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। রাস্তার দু’পাশে রিং বাঁধ নির্মাণ করায় বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি বের হতে না পেরে পুরো সড়ক জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক এখন অনেকটাই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

তেঁতুলতলা এলাকার এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “উন্নয়নের নামে আমাদের দুর্ভোগ বাড়ানো হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা পানির নিচে চলে যায়। শিশুদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে, অসুস্থ মানুষ নিয়ে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”

স্থানীয়দের দাবি, চিংড়ি ঘেরের স্লুইস গেট দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে রিং বাঁধের মধ্যে আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন চলাচল করতে গিয়ে অনেকে পড়ে গিয়ে আহতও হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধরা।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের রোলার ড্রাইভার টিটন বিশ্বাস বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় রোলার ঢুকাতে সমস্যা হচ্ছে। এজন্য কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।”

৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য বিজন কুমার হালদার বলেন, “রাস্তার কিছু অংশে বালু ভরাট করা হয়েছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতি প্রবেশে সমস্যা থাকায় কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।”

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা, অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে কোটি টাকার এই উন্নয়ন প্রকল্প এখন সাধারণ মানুষের জন্য দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সামনের বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

রামপালে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ: মামলা, গ্রেপ্তার ১

কোটি টাকার সড়ক কাজে চরম অবহেলা, উন্নয়নের নামে জনগণের সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রতারণা

প্রকাশঃ 02:42:25 pm, Thursday, 7 May 2026

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি
যে সড়ক দিয়ে মানুষের স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই সড়কই আজ হয়ে উঠেছে দুর্ভোগ, কান্না আর ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি। কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে খুঁড়ে ফেলে রাখা রাস্তা এখন কাদাপানি আর জলাবদ্ধতার এক নীরব অভিশাপ।

সামান্য বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানিতেই ডুবে যায় পুরো সড়ক, থেমে যায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। স্কুলগামী শিশুদের কাদা মাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে, অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্বজনদের, আর বৃদ্ধরা ঘরবন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনে যে মানুষ স্বস্তির স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তাদের কণ্ঠেই উচ্চারিত হচ্ছে হতাশা আর ক্ষোভ—এ কেমন উন্নয়ন, যেখানে জনগণের ভাগ্যে জুটেছে শুধু দুর্ভোগ আর দীর্ঘশ্বাস!

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নের শংকরদানা খেয়াঘাটে নির্মাণাধীন সেতু এলাকা থেকে তেঁতুলতলা হয়ে কাঁঠামারি বাজার পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৯শ’ ৪০ মিটার কার্পেটিং (পিচ) সড়ক নির্মাণ কাজ এখন ধীরগতির কারণে জনদুর্ভোগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আম্ফান পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এ উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব পায় চুয়াডাঙ্গার জাকাউল্লাহ এ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার কিছু অংশে নামমাত্র বালু ফেলে অধিকাংশ অংশ অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। রাস্তার দু’পাশে রিং বাঁধ নির্মাণ করায় বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি বের হতে না পেরে পুরো সড়ক জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক এখন অনেকটাই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

তেঁতুলতলা এলাকার এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “উন্নয়নের নামে আমাদের দুর্ভোগ বাড়ানো হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা পানির নিচে চলে যায়। শিশুদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে, অসুস্থ মানুষ নিয়ে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”

স্থানীয়দের দাবি, চিংড়ি ঘেরের স্লুইস গেট দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে রিং বাঁধের মধ্যে আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন চলাচল করতে গিয়ে অনেকে পড়ে গিয়ে আহতও হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধরা।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের রোলার ড্রাইভার টিটন বিশ্বাস বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় রোলার ঢুকাতে সমস্যা হচ্ছে। এজন্য কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।”

৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য বিজন কুমার হালদার বলেন, “রাস্তার কিছু অংশে বালু ভরাট করা হয়েছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতি প্রবেশে সমস্যা থাকায় কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।”

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা, অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে কোটি টাকার এই উন্নয়ন প্রকল্প এখন সাধারণ মানুষের জন্য দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সামনের বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।