রাজধানীর দরিদ্র শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্তেরও ঈদ বাজারের বড় ঠিকানা মৌচাক মার্কেট। মালিবাগে এই মার্কেট লাগোয়া আনারকলি সুপার মার্কেটও তাই।
মৌচাকের উল্টোদিকে ফরচুন সুপার মার্কেট।
গত কয়েক বছর ধরেই ঈদের সময়টাতে এই এলাকার যানজট এই শপিং মলগুলোর জন্য বেড়ে যায় কয়েক গুণ। কিন্তু এবার তেমনটা দেখা যাচ্ছে না।
মগবাজার ডাক্তার গলির বাসিন্দা রাহনুমা খানম তার কিশোরী মেয়ে আর দুই জমজ ছেলের জন্য সব সময় মৌচাক অথবা ফরচুন থেকেই কেনাকাটা করেন। কিন্তু এবার তিনি কেনাকাটার জন্য বেরই হননি।
ব্যাংকার রাহনুমা বললেন, “রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, মেয়েটাকে নিয়ে যেতেই তো সাহস পাচ্ছি না। এর মধ্যে সেদিন ফেইসবুকে দেখলাম এক ছোট্ট ছেলেকে কীভাবে মলেস্ট করছে বিক্রেতা! এসব দেশে ট্রমাটাইজড হয়ে যাচ্ছি। বেরুব কীভাবে?”
তাহলে কি ঈদের কেনাকাটা করবেন না- প্রশ্নে তিনি বলেন, “যেতে তো হবেই। মেয়েটা আবার একটু দেখেশুনে কিনতে ভালোবাসে।”
নারীর চলাচলের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ পরিবেশ বাংলাদেশে কখনোও ছিল, তা কেউ বলতে পারবে না। তবে সম্প্রতি যে নিরাপত্তার অভাব বেড়েছে, তা সবাই স্বীকার করছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি রাষ্ট্র ক্ষমতায় পালাবদলের পর ভিন্ন চিত্র দেখার কথাই বলছেন নারী অধিকারকর্মীরা।
লালমাটিয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী হেনস্তার পর হেনস্তকারীদের রক্ষায় একদলের দাঁড়িয়ে যাওয়া, নানাভাবে নারীকে দমিয়ে রাখার তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার দিকটি দেখাচ্ছে নারী সংগঠনগুলো।
বাংলাদেশে মহিলা পরিষদ গত ৭ মার্চ এক বিবৃতিতে বলেছিল, নানা অজুহাতে নারীকে হেনস্তা করা এবং নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। গণপরিসরে নারীর নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
এসব ঘটনা নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল। দৃশ্যত তারই ছাপ এখন দেখা যাচ্ছে ঈদ বাজারে।
ঈদের কেনাকাটা এবার আগের তুলনায় কমার কথা জানালেন উত্তরার মাধবী মার্টের মালিক সাবিনা ইয়াসমিন মাধবী।
হতাশ কণ্ঠে মাধবী বললেন, “এবার ঈদে সেল ( বিক্রি) পাচ্ছি না। গত ছয় বছরের মধ্যে এ অবস্থা হয়নি। ঈদের আগে বিক্রির তিন ভাগের এক ভাগও নেই।”
নারীদের অনিরাপদ বোধ এর একটি কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, “সরকার বদলের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মানুষের মনে ভয় এসেছে।”
আগে মেয়েরা বিপদ দেখলে পুলিশকে কল করেছে, ৯৯৯ (জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইন) এ কল করেছে। কিন্ত এখন পুলিশ অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কথায়ও এই নিষ্ক্রিয়তার কথাটি আসছে, যদিও বলা হচ্ছে যে পুলিশকে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
ঢাকার ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে রয়েছে ‘গুটিপা’র বিক্রয় কেন্দ্র। মূলত নারীরাই এখানকার ক্রেতা। গুটিপার মালিক তাসলিমা মিজি এবার ঈদের আগে ক্রেতাশূন্যতায় হা-হুতাশ করছেন।
নারীরা এবার কেমন আসছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আসছে না, একেবারেই আসছে না। এটা একেবারেই একটা ‘আনইউজুয়াল’ পরিস্থিতি।”
এ অবস্থা কেন বলে মনে করেন- জানতে চাইলে তাসলিমা বলেন, “সিকিউরিটি ইস্যু এখানে সবচেয়ে বড় ‘ফ্যাক্টর’।
“জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আমরা অংশীদার হয়েছিলাম। একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিলাম। কিন্তু যারা পরিবর্তিত অবস্থায় এল, তাদের কাজে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে না।”
ঢাকার অভিজাতদের এলাকা হিসাবে পরিচিত গুলশানের চিত্রও যে ভিন্ন নয়, তা বোঝা গেল পিংক সিটি শপিং মলে কেনা-কাটা করতে যাওয়া নাবিলা রহমানের কথায়।
তার বাবার বাসা এবং শ্বশুরের বাসা গুলশানেই। আগে রাতে কেনা-কাটা করলেও এবার দুপুরেই আসেন শপিংয়ে।
নাবিলা বলেন, “আজই এসেছি এবং আজকেই শেষ।”
কেন এই সিদ্ধান্ত তার কারণ জানিয়ে বলেন, “এই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রাতে বের হতে আতঙ্ক লাগছে। ফেইসবুকে যা দেখছি, তাতে করে আর এই ঢাকাকে নিরাপদ মনে হয় না।”
“নারীর জন্য এত অনিরাপদ হয়ে গেল এই দেশ, এটা ভাবতেই পারছি না আমি,” হতাশার সুরে বলেন নাবিলা।
ঈদ বাজারে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কাপড় কিনে জামা তৈরির ধুম পড়ে; এই সময়ে দর্জি দোকানগুলোতে ভিড় লেগেই থাকে।
কিন্তু মৌচাক মার্কেটের ঝর্ণা টেইলরে গিয়ে দোকানকর্মীদের তেমন ব্যস্ততা চোখে পড়ল না। একপাশে গজ কাপড়ের স্তুপ রেখে কর্মীরা কাজ করছিলেন।
এবার ব্যস্ত কেমন- জানতে চাইলে দোকানকর্মী রোহান বলেন, “গত ১১ বছরের এমন দেখি নাই।”
“গত বছরগুলোতে এই সময়ে এলে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না, আর এইবার….” না বলা কথাটুকু দীর্ঘ শ্বাসে বুঝিয়ে দেন তিনি।
শুধু যে অনিরাপদ বোধের কারণেই ক্রেতা কম, তা নয় বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
গুটিপা নিয়ে ব্যবসা শুরুর পর গত নয় বছরের চিত্র তুলে ধরে তাসলিমা মিজি বলেন, ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছরই তার ব্যবসা বেড়েছে। এবারই প্রথম ‘ব্যাকফুটে’ তিনি।
“কেবল আমি না, প্রতিটি ব্যবসায়ীর একই অবস্থা। সবার বিক্রি কমে গিয়েছে। আমার ওয়ার্কারদের বেতন কীভাবে দেব? অন্যান্য খরচ কিভাবে উঠবে? সে নিয়েই শঙ্কায় রয়েছি।”
উত্তরার মাধবী মার্টের মালিক মাধবী বলেন, “মানুষের হাতে টাকা নেই। সেটা নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তদের হাতেও না। সেভিংস (সঞ্চয়) যা রয়েছে, সেটা মানুষ খরচ করতে চাচ্ছে না। রেখে দিচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য।”
“মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে, রোজগার কমে যাচ্ছে, কিন্তু খরচ বেড়েছে। মানুষতো নিত্য খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে, বিলাস তো পরের কথা এখন,” যোগ করেন তিনি।